Categories
ঘরোয়া সমাধান স্বাস্থ্য ও সুস্থতা

কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ ও ঘরোয়া সমাধান

যখন মলত্যাগ কম হয় এবং মল ত্যাগ করা কঠিন হয়, তখন কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। এটি প্রায়শই ডায়েট বা রুটিনে পরিবর্তনের কারণে বা অপর্যাপ্ত ফাইবার গ্রহণের কারণে ঘটে থাকে। যদি তীব্র ব্যথা, মলে রক্ত বা কোষ্ঠকাঠিন্য তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় তবে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত।

কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ ও ঘরোয়া সমাধান

কোষ্ঠকাঠিন্য কি?

কোষ্ঠকাঠিন্য এমন একটি অবস্থা যেখানে একজন ব্যক্তির অস্বস্তিকর বা কদাচিৎ মলত্যাগ হয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তির কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে অল্প পরিমাণে মল, শক্ত ও  শুকনো মল, সাধারণত সপ্তাহে তিনবারের কম হয়ে থাকে। অর্থাৎ মল ত্যাগ করা ব্যক্তির জন্য কঠিন বা বেদনাদায়ক হয়ে উঠে।

কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রধান লক্ষণ

যদি কেউ নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি অনুভব করে তবে তার কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে:

  • সপ্তাহে তিনবারেরও কম মলত্যাগ
  • শক্ত বা শুকনো মল ত্যাগ করা
  • মলত্যাগের সময় চাপ বা ব্যথা
  • মলত্যাগের পরেও অন্ত্র সম্পূর্ণরূপে খালি হয়নি এই অনুভূতি থাকা

কোষ্ঠকাঠিন্য কেন হয়?

কোলনের প্রধান কাজ হল অবশিষ্ট খাবার থেকে পানি শোষণ করা। কোলন অত্যধিক পানি শোষণের ফলে শক্ত ও শুষ্ক মল হয়ে থাকে।

সাধারণত, কোলন (বৃহৎ অন্ত্র নামেও পরিচিত) দিয়ে খাদ্য চলাচলের সময় কোলন মল (বর্জ্য দ্রব্য) গঠনের সময় পানি শোষণ করে। পেশীর সংকোচন তখন মলটিকে মলদ্বারের দিকে ঠেলে দেয় এবং মল মলদ্বারে পৌঁছানোর সময়, বেশিরভাগ পানি শোষিত হয়ে যায়, যা মলটিকে শক্ত করে তোলে। []

যখন কোলনের পেশী সংকোচন ধীর বা মন্থর হয়, তখন মল কোলনের মধ্য দিয়ে খুব ধীরে চলে যায়, ফলে খুব বেশি পানি শোষিত হয়। কোষ্ঠকাঠিন্যের কিছু সাধারণ কারণগুলির মধ্যে নিম্নলিখিতগুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:

  • অনুশীলনের অভাব
  • পানিশূন্যতা
  • খাবারে অপর্যাপ্ত ফাইবার
  • বিরক্তিকর পেটের সমস্যা
  • মলত্যাগের তাগিদ উপেক্ষা করা
  • স্ট্রেস, রুটিনে পরিবর্তন, এবং এমন অবস্থা যা কোলনের পেশী সংকোচনকে ধীর করে দেয়
  • অভ্যাস বা জীবনযাত্রার পরিবর্তন, যেমন ভ্রমণ, গর্ভাবস্থা এবং বার্ধক্য
  • অন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে সমস্যা

কোষ্ঠকাঠিন্যের ঘরোয়া সমাধান

যদি কোষ্ঠকাঠিন্যের সম্মুখীন হন তবে নিম্নলিখিত দ্রুত চিকিত্সাগুলি কয়েক ঘন্টার মধ্যে অন্ত্রের সমস্যাকে প্ররোচিত করতে সহায়তা করতে পারে।

পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা

পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাঃ

  • ডিহাইড্রেশনের কারণে একজন ব্যক্তির কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এটি প্রতিরোধ করার জন্য, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা এবং হাইড্রেটেড থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে চিনিযুক্ত সোডার মতো কার্বনেটেড পানীয় পান করা ভাল নয়, কারণ এই পানীয়গুলি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে পারে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য আরও খারাপ করতে পারে।
  • কিছু গবেষণায় দেখা গেছে বদহজম বা ডিসপেপসিয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী ইডিওপ্যাথিক কোষ্ঠকাঠিন্যে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে কলের পানির চেয়ে ঝকঝকে পানি বেশি কার্যকর। []

ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খাওয়াঃ

বিভিন্ন ধরনের খাদ্যতালিকাগত ফাইবার আছে। কিন্তু সাধারণভাবে, দুই ধরনের ফাইবার রয়েছে।  অদ্রবণীয় ফাইবার এবং দ্রবণীয় ফাইবার।

  • অদ্রবণীয় ফাইবারঃ গমের ভুসি, শাকসবজি এবং গোটা শস্যে উপস্থিত  ফাইবার হজম ব্যবস্থার মাধ্যমে মলকে আরও দ্রুত এবং সহজে যেতে সাহায্য করতে পারে।
  • দ্রবণীয় ফাইবারঃ ওট ব্রান, বার্লি, বাদাম, বীজ, মটরশুটি, ডাল এবং মটর, সেইসাথে কিছু ফল এবং সবজিতে উপস্থিত ফাইবার পানি শোষণ করে এবং জেলের মতো পেস্ট তৈরি করে, যা মলকে নরম করে এবং এর সামঞ্জস্য উন্নত করে।

কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসার জন্য, পুষ্টিবিদরা প্রায়ই রোগীদেরকে তাদের খাদ্যতালিকায় ফাইবার গ্রহণ বাড়াতে বলেন। এর কারণ হল ফাইবার গ্রহণের পরিমাণ বাড়ানোর ফলে অন্ত্রের গতিবিধির বাড়তি এবং সামঞ্জস্যতা বৃদ্ধি পায়, যা তাদের জন্য মল ত্যাগ করা সহজ করে তোলে। এটি তাদের আরও দ্রুত পাচনতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যেতে সাহায্য করে।

ফাইবারসমৃদ্ধ সম্পূরক খাওয়াঃ

ফাইবার সম্পূরকগুলি সহজেই পাওয়া যায় এবং অন্ত্রের গতিবিধি প্ররোচিত করার জন্য কার্যকর। কারণ অপর্যাপ্ত ফাইবার খাদ্য, কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ হয়। ফাইবার মূলত মলের ভলিউম বৃদ্ধি করে। এটি অন্ত্রের মাধ্যমে শরীরের বাইরে মল বের করতে সাহায্য করে। []

দোকানে বা অনলাইনে ফাইবার পরিপূরক কিনতে পারেন। এখানে কয়েকটি সাধারণ রয়েছে:

  • ক্যালসিয়াম পলিকার্বোফিল (ফাইবারকন)
  • মিথাইলসেলুলোজ (সিট্রুসেল)
  • সাইলিয়াম (মেটামুসিল, কনসিল)

শারীরিক পরিশ্রম করাঃ

  • ব্যায়াম পাচনতন্ত্রের নীচের অংশের পেশীগুলিকে উদ্দীপিত করতে পারে। অন্ত্রের এই অংশটি মলের আকারে শরীর থেকে বর্জ্য বের করে দেয়।

বিভিন্ন গবেষণায় জানা গেছে যে ব্যায়াম কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণগুলিকে উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। কিছু মৃদু ব্যায়াম করার চেষ্টা করা যেতে পারে। যেমন- নিয়মিত হাঁটা, সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো বা জগিং। []

প্রোবায়োটিক খাবার বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণঃ

প্রোবায়োটিক খাবার বা সাপ্লিমেন্ট
  • প্রোবায়োটিকগুলি দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করতে সাহায্য করতে পারে। প্রোবায়োটিক হল উপকারী ব্যাকটেরিয়া যা প্রাকৃতিকভাবে অন্ত্রে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে বিফিডোব্যাকটেরিয়া এবং ল্যাকটোব্যাসিলাস। মানুষ প্রোবায়োটিক খাবার খেয়ে তাদের মাত্রা বাড়াতে পারে।
  • কিছু লোক যাদের দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য রয়েছে তাদের অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। আরও প্রোবায়োটিক খাবার খাওয়া এই ভারসাম্যকে উন্নত করতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করতে সাহায্য করতে পারে।
  • ২০১৯ সালের একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে ২ সপ্তাহের জন্য প্রোবায়োটিক গ্রহণ কোষ্ঠকাঠিন্য, মল ফ্রিকোয়েন্সি এবং মলের সামঞ্জস্য বৃদ্ধি করতে সাহায্য করতে পারে।

প্রোবায়োটিক সম্পূরকগুলি গ্রহণ করতে পারেন, যা অনলাইনে পাওয়া যায়। এছাড়াও প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। প্রোবায়োটিক খাবারের মধ্যে রয়েছে:

  • দই
  • সাওয়ারক্রাউট
  • কিমচি

লো FODMAP ডায়েট গ্রহণঃ

কোষ্ঠকাঠিন্য, আইবিএস এর একটি উপসর্গ হতে পারে। নিম্ন FODMAP ডায়েট হল একটি নির্মূল খাদ্য যা আইবিএস – এর চিকিৎসায় সাহায্য করে এবং আইবিএস – সম্পর্কিত কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি দিতে পারে।

ম্যাগনেসিয়াম সম্পূরক গ্রহণঃ

পরিমিত পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম সম্পূরক গ্রহণ কোষ্ঠকাঠিন্য উপশম করতে সাহায্য করতে পারে। ডাক্তাররা অস্ত্রোপচার বা অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির আগে অন্ত্র প্রস্তুত এবং পরিষ্কার করার জন্য এটি উচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করেন।

কিউই ফলঃ

কিউই ফলগুলিতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে এবং ২০১৯ এ এক গবেষণা পরামর্শ দেয় যে তারা হজমে সহায়তা করতে পারে। অর্থাৎ কিউই ফলটি একটি উপকারী প্রাকৃতিক রেচক হতে পারে।

দুগ্ধজাত খাবার এড়ানোর চেষ্টা করাঃ

  • অসহিষ্ণু ব্যক্তিদের মধ্যে, দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার ফলে অন্ত্রের নড়াচড়ার উপর প্রভাবের কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।
  • ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা কিছু লোকের দুগ্ধজাত খাবারে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এই ব্যক্তিদের মধ্যে, খাদ্য থেকে দুগ্ধ অপসারণ করলে লক্ষণগুলি উপশম করতে সাহায্য করতে পারে।

কখন ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে?

যদি উপসর্গগুলি না যায় বা ব্যক্তির কোলন বা মলদ্বার ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস থাকে তবে সেক্ষেত্রে একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।  ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজ (NIDDK) সুপারিশ করে যে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি লক্ষ্য করলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবেঃ

  • মলদ্বার থেকে রক্তপাত
  • মলের মধ্যে রক্ত
  • অবিরাম পেটে ব্যথা
  • পিঠের নীচে ব্যথা
  • একটি অনুভূতি যে গ্যাস আটকে আছে
  • বমি
  • জ্বর
  • ব্যাখ্যাহীন ওজন হ্রাস
  • অন্ত্রের গতিবিধিতে হঠাৎ পরিবর্তন

মল ত্যাগ করতে না পারা অস্বস্তিকর এবং হতাশাজনক। তবে খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনধারায় পরিবর্তন না আনলে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। হাঁটা, ব্যায়াম করা, তরল পান করা এবং খাবারে কিছু উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার অন্তর্ভুক্ত করলেই অস্বস্তিকর কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করা সম্ভব।

Categories
খাদ্যাভ্যাস ঘরোয়া সমাধান

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করলার যত উপকারিতা

করলা স্বাদে তেতো হলেও, এতে থাকে অনেক পুষ্টিগুণ। করলায় থাকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, জিংকসহ বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করলার জুস খুবই উপকারী। উপমহাদেশ ও চীনের গ্রামাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসের ওষুধ হিসেবে করলার রস পান করে আসছেন। 

এছাড়া বাত রোগে, লিভার ও শরীরের কোনো অংশ ফুলে গেলে তা থেকে পরিত্রাণ পেতে করলা ভালো পথ্য। নিয়মিত করলা খেলে জ্বর, হাম ও বসন্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করলা

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করলা জুসের উপকারিতা

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিকের মত কাজ করে করলা। এতে এমন উপাদান আছে, যা ইনসুলিনের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিন করলা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এক গবেষণায় করলার অ্যান্টিডায়াবেটিক বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে। এটি গ্লুকোজ বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে একটি হাইপোগ্লাইসেমিক প্রভাব প্রয়োগ করে। [1]

করলার শাঁস, বীজ এবং সম্পূর্ণ উদ্ভিদের নির্যাসে একটি হাইপোগ্লাইসেমিক প্রভাব রয়েছে। করলার মধ্যে উপস্থিত স্যাপোনিন, অ্যালকালয়েড এবং পলিফেনলগুলি ইনসুলিন সহনশীলতা এবং গ্লুকোজ গ্রহণ বৃদ্ধির জন্য দায়ী। [2]

এছাড়াও করলায় কয়েকটি সক্রিয় পদার্থ আছে। তাদের মধ্যে একটি হলো চারেন্টিন। এটি রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখে। করলায় আরও আছে পলিপেপটাইড-পি বা পি-ইনসুলিন নামক একটি যৌগ। যা প্রাকৃতিকভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

করলা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কারণ এটি রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে পারে। ইনসুলিনের নিঃসরণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে করলা।

এছাড়াও করলায় কয়েকটি সক্রিয় পদার্থ আছে। তাদের মধ্যে একটি হলো চারেন্টিন। এটি রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখে। করলায় আরও আছে পলিপেপটাইড-পি বা পি-ইনসুলিন নামক একটি যৌগ। যা প্রাকৃতিকভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

করলা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কারণ এটি রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে পারে। ইনসুলিনের নিঃসরণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে করলা।

করলা কিভাবে রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে? 

করলা ইনসুলিন রেজিস্টেন্স কমিয়ে রক্ত থেকে শরীরের কোষগুলোর সুগার গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। তা ছাড়া করলা শরীরের কোষের ভেতর গ্লুকোজের বিপাক ক্রিয়াও বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তের সুগার কমে যায়।

বিজ্ঞানীরা মোট তিনটি উপাদান পেয়েছেন যাদের হাইপোগ্লাইসেমিক ক্রিয়া আছে – এই তিনটি উপাদান হলো – চারেন্টিন, ভিসিন, পলিপেপটাইড-পি। এদের মধ্যে চারেন্টিন এর খুব ভালো গ্লাইসেমিক প্রভাব আছে। এছাড়া করলাতে লেকটিন নামে একটি উপাদান পাওয়া যায় যা রক্তের গ্লুকোজের ঘনত্ব কমিয়ে দেয় |

করলা এবং করলা থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন উপাদানসমুহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে আমাদের রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এটি যেসব পদ্ধতিতে আমাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমায় সেগুলি হল-

  • এটি পেরিফেরাল এবং স্কেলেটাল পেশিতে গ্লুকোজের ব্যবহার বৃদ্ধি করে।
  • ক্ষুদ্রান্ত্রে গ্লুকোজের গ্রহণ কমায়।
  • গ্লুকোনিওজিক হরমোনের উৎপাদন ও ক্রিয়াকৌশলে বাধা প্রদান করে।
  • আইলেটস অব লেঙ্গারহেন্স এর বিটা সেলকে সংরক্ষণ করতে সাহায্য করে।

গবেষণা হতে দেখা যায় যে, করলার রস তাৎক্ষণিকভাবে ৩০ মিনিটের মধ্যে রক্তে শর্করার মাত্রা কমায় এবং ১২০ মিনিটে উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।

অর্থাৎ করলা ইনসুলিন রেজিস্টেন্স কমিয়ে রক্ত থেকে শরীরের কোষগুলোর সুগার গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। তা ছাড়া করলা শরীরের কোষের ভেতর গ্লুকোজের বিপাক ক্রিয়াও বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তের সুগার কমে যায়।

শরীরে করলার অন্যান্য উপকারিতা

ডায়াবেটিস কমাতে সাহায্য করে

করলা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য পথ্য হিসাবে বিবেচিত হয়। যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে তাদের বেশি পরিমাণে তেতো খাওয়া উচিত। করলা/উচ্ছের রস এবং এই গাছের পাতা নিয়মিত সেবন করলে তা রক্তে চিনির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।

১। হজমের জন্য ভাল– খাবার হজম করতে সহায়ক এবং হজম শক্তি বর্ধক এই সব্জি। তবে শুধু হজম শক্তিই নয়, করলা ফাইবারে পূর্ণ হওয়ায় এটি কোষ্ঠকাঠিন্যর মতো সমস্যা থেকেও মুক্তি দেয়।

২। হার্ট ভালো রাখে- এর তিক্ত রস এলডিএল অর্থাৎ খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি হ্রাস করে।

৩। প্রস্টেট ক্যান্সার- করলা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং অ্যালার্জি ও যে কোন রোগের সংক্রমণ রোধ করে। এটি ক্যান্সার কোষের বিস্তার রোধ করে। নিয়মিত করলা খেলে স্তন ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার এবং প্রস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

৪। ওজন নিয়ন্ত্রণ- ক্যালরি ও ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়ায় করলা ওজন হ্রাসে সহায়তা করে। এটি অ্যাডিপোজ কোষ যা দেহে ফ্যাট সংরক্ষণ করে, তার গঠন এবং বৃদ্ধি বন্ধ করে। এটি পরিপাক ক্রিয়া উন্নতি করে এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টগুলি শরীরকে ডিটক্সাইয়েটে সহায়তা করে যাতে চর্বি হ্রাস করতে পারে।

৫। ক্ষত নিরাময়ে করলা- করলার দুর্দান্ত একটি বৈশিষ্ট্য এটি। কোন স্থানে ক্ষত হলে করলার ব্যবহার তৎক্ষণাৎ ওই স্থানের রক্ত প্রবাহ এবং রক্ত জমাট বাঁধা নিয়ন্ত্রণ করে, যার ফলে ক্ষতের দ্রুত নিরাময় হয়।

৬। রক্ত পরিশোধক– করলাতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এটি রক্ত সঞ্চালন উন্নত করতে সহায়তা করে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।

৭। দেহে শক্তি জোগায়- নিয়মিত করলা সেবনে দেহে শক্তির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

৮। চোখের সমস্যা- করলা ভিটামিন এ সমৃদ্ধ, এটি ছানি প্রতিরোধ করে এবং দৃষ্টি শক্তিশালী করে। 

৯। শক্তিবর্ধক- করলার রস শক্তিবর্ধক হিসেবেও কাজ করে। এটি স্ট্যামিনা বাড়ানোর পাশাপাশি ভালো ঘুমে সহায়তা করে।

এছাড়াও এটি অনিদ্রার মতো সমস্যা হ্রাস করে। ডায়রিয়া ও পেটের অন্যান্য সমস্যাও কমাতে সহায়ক এই সব্জি। আমাদের দেহের ইমিউন সিস্টেমকে বাড়িয়ে তুলে শরীরকে রোগে সংক্রামিত হওয়ার থেকে সুরক্ষা প্রদান করে করলা।

  • যদিও এটি বেশিরভাগ মানুষের পক্ষে নিরাপদ, তবে এটি গর্ভবতী মহিলাদের খাওয়া উচিত নয় কারণ এর বীজ এবং রস প্রাণী গর্ভপাত ঘটানোর কারণ হিসেবে পরিচিত। 
  • বুকের দুধ খাওয়ানো মহিলাদের করলা খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। এর বিষাক্ত পদার্থের একটি সংখ্যা তাদের শিশুর ক্ষতি করতে পারে।
  • করলা খাওয়ার কারণে যে সমস্ত মানুষের গ্লুকোজ ৬ ফসফেট ডিহাইড্রোজিনেস এনজাইম ঘাটতির জন্য ‘ফেবিজম’ (লোহিত কণিকা ভেঙ্গে যায়, হিমোলিটিক রক্তাল্পতা ঘটায়) নামক অবস্থার বৃদ্ধি হতে পারে এবং তাদেরও এটি এড়িয়ে চলা উচিত। 
  • রস হিসাবে, যদি এটি বেশি পরিমাণে খাওয়া হয় তবে এটি পেট ব্যথা, ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে।

ডায়াবেটিক রোগীরা করলা কিভাবে খাবেন?

শুধু করলার জুস খেয়ে কি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? 

ঔষধ, শরীরচর্চা আর নিয়ম মেনে খাওয়া-দাওয়া করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে বটে, কিন্তু তা কোনভাবেই পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব নয়। তাই যদি কেউ ভেবে থাকেন যে কোন রকমের নিয়ম না মেনে শুধুমাত্র করলার জুস খেয়ে ডায়াবেটিস নিযন্ত্রণ করা যাবে তবে তা একেবারেই ভুল ধারণা।

একটানা কতদিন করলার জুস খাওয়া যাবে? 

তিন মাস টানা খাওয়ার পর ১২-১৫ দিন খাওয়া বন্ধ করতে হবে। বাজারে চলতি যে জুস পাওয়া যায়, সেগুলি না খাওয়াই ভাল। এতে সোডিয়াম বেনজোইট মেশানো থাকে ফলে এগুলির কার্যকারিতা একটু হলেও কম হবে।

অতএব দেখা যাচ্ছে, করলার গুণাগুণ ও উপকারিতা ব্যাপক। করলা শুধু ডায়াবেটিক রোগীদের জন্যই না, সবার জন্য স্বাস্থ্যকর একটি সবজি। এটি শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

Diabetes Ad
Categories
Foods ঘরোয়া সমাধান

অশ্বগন্ধার উপকারিতা এবং খাওয়ার নিয়ম

অশ্বগন্ধা মূলত ভেষজ জড়িবুটির মধ্যে অন্যতম একটি উপাদান। সেই প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসাবে অশ্বগন্ধা ব্যবহার হয়ে আসছে। মনে করা হয় ৬০০ খ্রিস্টাব্দ বা তারও আগে থেকে অশ্বগন্ধার ব্যবহার শুরু হয়েছে। আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রেও একটি গুরুত্বপুর্ন উপাদান হিসাবে অশ্বগন্ধা স্থান পেয়েছে। এখনকার সময়ে বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল স্টাডিতেও মানব শরীরে এর উপকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। [1]

আজকের এই লেখার মাধ্যমে জানতে পারবেন অশ্বগন্ধার বিভিন্ন উপকারিতা সম্পর্কে। এছাড়াও কোন রোগে এটি কিভাবে ব্যবহার করবেন এবং কতটুকু পরিমাণে খেলে এটি আপনার জন্য বেশি উপকারী হবে সে সম্পর্কেও জানতে পারবেন। তাহলে চলুন শুরু করা যাক।

অশ্বগন্ধা কি? 

ভেষজ উদ্ভিদ অশ্বগন্ধা

অশ্বগন্ধার প্রধান উপকারিতাগুলো জানার আগে অশ্বগন্ধা আসলে কি সেটা জানা জরুরি। এটি মূলত এক প্রকার ভেষজ উদ্ভিদ। ভারত, পাকিস্তান, স্পেন, আফ্রিকা, মধ্য প্রাচ্য এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে এই গাছ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই গাছের পাতা, ফল, বীজ, শিকড় সবকিছুই আয়ুর্বেদিক ঔষুধ তৈরী করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। তবে এর শেকড়ের ব্যবহার সবচেয়ে প্রচলিত। ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রে এটি অত্যাশ্চর্য ভেষজ নামেও পরিচিত। 

মানসিক চাপ কমাতে এটি অধিক কার্যকরী বলে একে অ্যাডাপ্টোজেনও বলা হয়। অ্যাডাপ্টোজেনের অর্থ মানসিক চাপ মুক্তির এজেন্ট। তবে অশ্বগন্ধা নামের উৎপত্তি হচ্ছে ঘোড়ার থেকে। এর শেকড় থেকে ঘোড়ার মূত্রের মতো এক ধরনের গন্ধ আসায় এটি অশ্বগন্ধা নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Withania Somnifera।

অশ্বগন্ধায় উপস্থিত উপকারী উপাদানসমূহ 

অশ্বগন্ধার এত এত গুণের প্রধান কারণ হচ্ছে এতে উপস্থিত ফাইটোকেমিক্যাল। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, অশ্বগন্ধার নির্যাসে ৩৫ ধরনের ফাইটোকেমিক্যাল উপাদান থাকে। যার ফলে সঠিক পরিমাণে ব্যবহার করলে এটি ক্যান্সার প্রতিরোধেও সাহায্য করে। এছাড়াও এতে উপস্থিত অন্যান্য উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যালকালয়েড, স্ট্রেরয়ডাল, ল্যাক্টনস, ট্যানিনস, স্যাপোনিনস, উইথানন, উইথাফেরিন এ, ডি, ই , উইথাননোলাইড ইত্যাদি।

অশ্বগন্ধার কিছু গুরুত্বপুর্ন উপকারিতা 

অশ্বগন্ধার উপকারিতা

১। ঘুমের সমস্যা সমাধান করে 

অশ্বগন্ধায় অ্যানজাইলটিক উপাদান থাকার কারণে এটি মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক এবং মনোযোগ বৃদ্ধি করে। আর মানুষের শরীরে স্ট্রেস এর পরিমাণ কম থাকলে এবং মস্তিষ্কের উপর চাপ কম থাকলে ঘুমের সমস্যা দূর হয়। এর প্রধান কারণ হচ্ছে অশ্বগন্ধা স্নায়ু শিথিল রাখতে সাহায্য করে। যার ফলে আপনার আর ঘুমের ওষুধের প্রয়োজন হবেনা।  

২। যৌন ক্ষমতা ও যৌন উদ্দীপক

পুরুষের শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি করে প্রাচীনকাল থেকেই অশ্বগন্ধার সুনাম রয়েছে। এছাড়াও নিয়মিত এটি খেলে শরীরে টেস্টোস্টেরন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। যার ফলে যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতা দুই-ই বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল স্টাডিতেও প্রমাণিত হয়েছে যে এটি কামশক্তি বৃদ্ধি এবং শুক্রতারুল্যের সমস্যা সমাধান করে।

৩। থাইরয়েড সমস্যায় উপকারী 

থাইরয়েড সমস্যায় অশ্বগন্ধা খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত এটি খেলে শরীরে থাইরয়েড হরমোন বৃদ্ধি পায়। তাই যাদের শরীরে থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ কম থাকে তাদের জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী। 

৪। ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে 

কিছু কিছু গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, অশ্বগন্ধা ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। এতে এমন কিছু উপাদান রয়েছে যেগুলো শরীরে ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধি পেতে বাঁধা দেয়। যার ফলে নিয়মিত অশ্বগন্ধা খেলে কোলন ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, ওভারিয়ান ক্যান্সার, প্রস্টেট ক্যান্সার এবং ব্রেন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পায়।  

৫। মাসিকের সমস্যায় কার্যকর 

অধিকাংশ মেয়েদের মাসিকের সময় তীব্র পেটে ব্যথার সমস্যা লক্ষ্য করা যায়। যার ফলে প্রতিমাসেই পিরিয়ড চলাকালীন তারা তীব্র অসুস্থতায় ভোগে। কিন্তু অশ্বগন্ধা এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। নিয়মিত যদি নির্দিষ্ট পরিমাণে অশ্বগন্ধা খাওয়া যায় তাহলে পেটে ব্যথার এই সমস্যা থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। শুধু তাই নয়, অনিয়মিত মাসিকের সমস্যাও এটি সমাধান করে। 

৬। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে 

অশ্বগন্ধা মানবদেহে রক্ত চলাচল নিয়ন্ত্রনে রাখে। যার ফলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা কমে যায় এবং হৃদপিণ্ড অন্যান্য অনেক রোগ থেকেও সুস্থ থাকে। আর শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকার ফলে আর্থ্রাইটিসের ব্যথাও উপশম হয়। এছাড়া এটি শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সাহায্য করে। 

৭। ত্বক ও চুলের যত্নে সহায়ক 

অশ্বগন্ধা যৌবন ধরে রাখতে সাহায্য করে। তাই নিয়মিত অশ্বগন্ধা খেলে ত্বকের বলিরেখা কিংবা বয়সের ছাপ পড়ার মতো সমস্যা থেকে দূরে থাকবেন। এটি ত্বককে ভেতর থেকে সুস্থ রাখে এবং উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। এছাড়াও এটি চুল পড়া রোধ করে এবং চুলের গোঁড়া মজবুত করতে সাহায্য করে।

অশ্বগন্ধা খাওয়ার নিয়ম 

অশ্বগন্ধার শেকড় এবং গুঁড়া দুইভাবেই খাওয়া যায়। তবে এখন অশ্বগন্ধা গুঁড়া খাওয়ার প্রচলন সবচেয়ে বেশি। কারণ বাজারে শেকড়ের থেকে গুঁড়া বেশি দেখা যায়। ভালো ফল পেতে প্রতিদিন ৪-৫ গ্রাম অর্থাৎ ১ চামচ অশ্বগন্ধা গুঁড়া খেতে পারবেন।

আপনি চাইলে এটি কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে, হালকা গরম দুধে মিশিয়ে অথবা মধু মিশিয়েও খেতে পারেন। প্রতিদিন সকালে ১ চামচ অথবা সকালে ১/২ চামচ আর রাতে ঘুমানোর আগে ১/২ চামচ খেতে পারবেন। তবে আপনার সমস্যার উপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞ একজন ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অশ্বগন্ধা খাওয়া সবথেকে নিরাপদ।

অশ্বগন্ধা খাওয়ার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

অশ্বগন্ধা সম্পুর্ন প্রাকৃতিক উপাদান অতিরিক্ত মাত্রায় সেবনের ফলে কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তবে অশ্বগন্ধা খাওয়ার সময় অবশ্যই কিছু বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখা জরুরী।

  • অশ্বগন্ধা খাওয়ার ফলে অনিদ্রার সমস্যা সমাধান হয় এবং ঘুম ভালো হয়। তাই এটি খাওয়াকালীন আলাদা ঘুমের ওষুধ না খাওয়াই উত্তম। 
  • আর একটানা দীর্ঘদিন অশ্বগন্ধা খেলে ডায়রিয়া, গ্যাস্ট্রিক, বমির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই একটানা কিছুদিন খাওয়ার পর আবার ১০-১৫ দিন গ্যাপ দিয়ে খাওয়া শুরু করতে হবে।  
  • যেহেতু অশ্বগন্ধা রক্ত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে, এতে করে রক্ত পাতলা হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। তাই কোন অস্ত্রপচারের আগে, পরে বা সমসাময়িক এটি খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। না হলে অধিক রক্তপাত হয়ে মারাত্মক বিপদ হতে পারে।
  • অশ্বগন্ধা প্রাকৃতিকভাবেই শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ফলে এটি খাওয়ার সময় অন্য কোন শর্করা কমানোর ওষুধ না খাওয়াই উত্তম। তা না হলে রক্তে শর্করার মাত্রা অধিক পরিমাণে কমে গিয়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে। 
  • গর্ভবতী মহিলাদের অশ্বগন্ধা খেলে গর্ভপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর যেসব মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান তাদের ক্ষেত্রেও অশ্বগন্ধা না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

অশ্বগন্ধা সম্পর্কিত কিছু সাধারণ প্রশ্ন

প্রতিদিন কি অশ্বগন্ধার গুঁড়ো খাওয়া যেতে পারে ?

নির্দিষ্ট পরিমাণে প্রতিদিন অশ্বগন্ধার গুঁড়া খাওয়া যাবে। ওয়েব এম ডি এর তথ্য অনুযায়ী, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন ১০০০ মিলিগ্রাম অশ্বগন্ধা ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত খেতে পারবেন। তবে সমস্যা অনুযায়ী সেবনের মাত্রা কমবেশি হতে পারে। তাই খাওয়ার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। [2]

অশ্বগন্ধার গুঁড়া খেলে কি লম্বা হওয়া যায়?

অশ্বগন্ধার গুঁড়া খেয়ে লম্বা হওয়ার মতো কোন তথ্য এখনো প্রমাণিত হয়নি। তবে এটি আমাদের হাড় মজবুত করতে সাহায্য করে এবং হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি করে। এছাড়াও এর আরও অনেক উপকারিতার কথা ইতোমধ্যেই আপনারা জানতে পেরেছেন।

কোথায় পাওয়া যাবে অশ্বগন্ধার গুঁড়া? 

যেকোন সুপারশপেই এখন অশ্বগন্ধার গুঁড়া পাওয়া যায়। আবার বাজারেও বিভিন্ন দোকানে এর দেখা পাবেন। কিন্তু নির্ভেজাল গুঁড়া পাওয়া এখন খুবই কষ্টকর। কারণ বাজারের দোকানে যেগুলো দেখা যায় সেগুলো খোলা অবস্থায় থাকার ফলে ধুলাবালি মিশে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাই সুপারশপ থেকে অনলাইন স্টোর থেকে প্যাকেটজাত অস্বগন্ধার গুঁড়া কিনতে পারেন।

অশ্বগন্ধার কোন ক্ষতিকর দিক আছে কি? 

অশ্বগন্ধার কোন ক্ষতিকর দিক নেই। তবে এটি খাওয়ার মাত্রার উপর নির্ভর করে কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আছে যেগুলো উপরে বিস্তারিতভাবে বর্ননা দেওয়া হয়েছে। অশ্বগন্ধা খাওয়ার সময় শুধু এই ব্যাপারগুলো মাথায় রাখলেই চলবে।

মেয়েদের জন্য অশ্বগন্ধার কোন উপকারিতা কি? 

মেয়েদের ঋতুস্রাবের সময় যে তীব্র পেটে ব্যথা করে, অশ্বগন্ধা সেটা লাঘব করে। এছাড়াও অনিয়মিত ঋতুস্রাবের সমস্যা এবং বন্ধ্যা নারীর ক্ষেত্রেও এর উপকারিতা লক্ষ্য করা গেছে। নিয়মিত এটি খেতে থাকলে শরীরের রক্ত চলাচল ঠিক থাকে এবং হরমোনাল ইমব্যালেন্স দূর হয়। ফলে মাসিকের সমস্যা ঠিক হওয়ার পাশাপাশি বন্ধ্যাত্বের সমস্যাতেও উপকার পাওয়া যায়। [3]

পরিশেষে

তাহলে বুঝতেই পারছেন ঔষধি গাছ হিসাবে অশ্বগন্ধার উপকারিতা অনেক বেশি। তাই নিয়ম মেনে সঠিক পরিমাণে যদি নিয়মিত এটি সেবন করতে পারেন তাহলে নানাবিধ রোগ থেকে দূরে থাকতে পারবেন। তবে নির্দিষ্ট কোন রোগের জন্য অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে অশ্বগন্ধা খাওয়া উচিত।

তথ্যসূত্রঃ healthline.com | webmd.commedicalnewstoday.com

Categories
ঘরোয়া সমাধান

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চিরতার ভূমিকা

চিরতার ইংরেজি প্রতিশব্দ Swertia। চিরতা মূলত একটি ভেষজ উদ্ভিদ যা ভেষজ চিকিৎসা ও চিকিৎসা সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর এক একটি গাছের উচ্চতা প্রায় দেড় থেকে দুই মিটার। মূলত ফুল থাকা আবস্থায় পুরো গাছ তুলে রোদে শুকিয়ে ঔষধ তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। চিরতা মূলত জ্বর, অ্যালার্জি, চুলকানি, উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রনের পাশাপাশি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখে। চলুন জেনে নি, চিরতা কিভাবে রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণ করে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চিরতার ভূমিকা

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চিরতার উপকারিতা

বর্তমান সময়ে ডায়াবেটিস বলতে গেলে প্রকট আকার ধারন করছে। ছোট থেকে বয়স্ক সকল বয়সী মানুষের ডায়াবেটিস হতে পারে। বিশেষ করে মোটা বা স্থুলকায় ও বয়স্কদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। চিরতা রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে থাকে। চিরতা দেহের অভ্যন্তরে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন নামক হরমোন তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। তাতে রক্তের সুগারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ডায়বেটিসের সমস্যার উন্নতি হয়।

চিরতা কিভাবে রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণ করে?

চিরতার ব্যতিক্রমী হাইপোগ্লাইসেমিক বৈশিষ্ট্য শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রাকে শান্ত করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। β-অগ্ন্যাশয় কোষ থেকে ইনসুলিন উৎপাদন চিরতা ফর্মুলেশন গ্রহণে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটি গ্লুকোজে স্টার্চের ভাঙ্গন কমাতে সাহায্য করে যা ফলস্বরূপ রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং অবশেষে ডায়াবেটিস পরিচালনায় সহায়তা করে। [1]

Swertia প্রজাতির বিভিন্ন উপাদান থাকা সত্ত্বেও, জ্যান্থোন হল এই প্রজাতির সবচেয়ে বিশিষ্ট প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত যৌগ, যার মধ্যে একটি স্বতন্ত্র পলিফেনলিক গঠন রয়েছে এবং অনেক ফার্মাকোলজিক্যাল প্রভাব দেখায়, যেমন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিম্যালেরিয়াল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিটিউমার, অ্যান্টি-ডায়াবেটিস এবং হেপাটোপ্রোটেকটিভ বৈশিষ্ট্য। 

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এস চিরতা ৯৫% ইথানোলিক নির্যাস; খাওয়ানোর পর, খালি পেটে ও গ্লুকোজ লোডেড অ্যালবিনো ইঁদুরগুলিতে উল্লেখযোগ্য রক্তে শর্করার কমার প্রভাব দেখা যায়। এস চিরতা নির্যাস মৌখিকভাবে দেওয়ার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর অ্যালবিনো ইঁদুরের মধ্যে টলবুটামাইডের হাইপোগ্লাইসেমিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়। [2]

চিরতার যত উপকারিতা

সুপ্রাচীনকাল থেকে চিরতা সমগ্র বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। খেতে তিতা হলেও এটি নানান প্রাকৃতিক ও ভেষজ গুণাগুণে ভরপুর। এই তিতা খাবার আমাদের দেহের ভিতর থাকা বিষাক্ত পদার্থ পরিষ্কার করে দেহকে সুস্থ্য রাখে এবং পাশাপাশি বিপাকীয় কার্যক্রম বাড়ায়। এছাড়াও তিতা_জাতীয় খাবার নানা রোগের উপশম হিসেবে কাজ করে।

  • দেহে রক্তকোষ গঠনের মাধ্যমে রক্তশূন্যতা কমায়। ঋতুস্রাব বা মাসিকে অনেকের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। তাদের জন্য চিরতার রস অনেক উপকারী। এমনকি কোথাও কেটে গেলে সে কাটা স্থানে চিরতার রস লাগিয়ে দিলে দ্রুত রক্ত পড়া বন্ধ হয়। অভ্যন্তরীন রক্তক্ষরণ, নাক দিয়ে রক্তপড়া এসব বন্ধ করতেও চিরতা অত্যন্ত কার্যকর।
  • চিরতায় প্রচুর পরিমাণে হেপাটোপ্রোটেকটিভ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি শরীর থেকে টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে এবং লিভারকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এটি লিভারের নতুন কোষের পুনর্জন্মেও সাহায্য করে।
  • গবেষণায় পাওয়া গেছে, যারা নিয়মিত চিরতার রস খায়, তাদের দেহে ক্যান্সারের জীবাণু খুব সহজে ঢুকতে পারে না। বিশেষ করে স্তন ক্যান্সার রুখতে চিরতা অনেক উপকারী।
  • চুল পড়া কমাতে চিরতার ভূমিকা রয়েছে। মাথার চুল পড়া শুরু করলে এক কাপ পরিমান গরম পানিতে ৫-৭ গ্রাম চিরতা ভিজিয়ে রাখতে হবে। সকালে পানি ছেকে নিয়ে সেই পানি দিয়ে মাথা ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে।
  • শীতকালে ঘা হলে কিছুতেই শুকাতে চায় না। এক্ষেত্রে আগের দিন রাতে এক কাপ গরম পানিতে ৫ গ্রাম চিরতা ভিজিয়ে রেখে পরদিন সেই পানি ছেঁকে পচা ঘা ধুয়ে দিতে হবে। এভাবে ২-৪ দিন চিরতা ব্যবহার করলে ঘায়ের পচানি চলে যাবে ও দ্রুত শুকাবে। 
  • উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল, উচ্চরক্তচাপ, মুটিয়ে যাওয়া মানুষের নিয়মিত চিরতার পানি পান করা উচিত।

যাদের অ্যাজমা বা হাঁপানি জাতীয় রোগ আছে তাদের জন্য চিরতা অনেক উপকারী। আধা গ্রাম চিরতার গুঁড়ো ৩ ঘণ্টা অন্তর মধুসহ চেটে খেলে হাঁপানি দূর হয়।

ডায়াবেটিক রোগীরা চিরতা কিভাবে খাবেন? 

আগের দিন রাতে শুকনো চিরতা গুঁড়ো ৪-৫ গ্রাম পরিমাণ এক গ্লাস (২৫০ মিলিলিটার) গরম পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরের দিন ওটা ছেঁকে সকালে খালি পেটে খেতে হবে। এটি খেতে তিতা লাগলেও ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

শুধু কি চিরতা খেলেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে?  

চিরতা পাতায় বেশ কিছু এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা ডায়াবেটিস induced oxidative stress কমিয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সাহায্য করে। তবে শুধুমাত্র চিরতা খেয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। হেলদি লাইফস্টাইলের পাশাপাশি চিরতা, মেথি, জাম, সজিনা এগুলো খেলে (প্রাকৃতিক উপায়ে) ভাল ফলাফল পাওয়া যায়।

একটানা কতদিন চিরতা খাওয়া যাবে? 

একটানা বেশি পরিমান কিংবা ১০ থেকে ১৫ দিনের বেশি চিরতা খাওয়া উচিত না, সমপরিমাণ দিন বিরতি নিয়ে আবার  খাওয়া উচিত। এতে চিরতা থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়।

চিরতা সেবনে কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি?

উপকারের পাশাপাশি মাত্রাতিরিক্ত চিরতা সেবনে ক্ষতি হতে পারে। 

  • গর্ভবতী মায়েদের ও শিশুদের খাওয়ানোর আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। 
  • ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিরতা খাওয়া ভাল। কারণ চিরতা ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে ব্লাড সুগার লেভেল কমিয়ে আনে। অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়া হলে লো ব্লাড সুগারের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
  • অতিরিক্ত চিরতা সেবনের ফলে আপনার ব্লাড প্রেসার কমে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। 
  • চিরতা অস্ত্রোপচারের সময় এবং পরে ব্যবহার না করাই ভাল।

পরিশেষে 

এই লেখা থেকে স্পষ্ট যে, ডায়াবেটিসে চিরতা ভালো কাজ করে। শুধু তাই নয়, এটি তিতা স্বাদের হলেও শরীরের জন্য খুবই উপকারী একটি ভেষজ। অন্যান্য অনেক রোগের জন্যও চিরতা খুবই উপকারী। তাই ডায়াবেটিসের রোগী ছাড়াও এটি যেকোন ব্যক্তি যদি নিয়মিত খেতে পারে, তাহলে রোগ-বালাই তার থেকে অনেক দূরে অবস্থান করবে।

Categories
ঘরোয়া সমাধান রোগ বালাই

বদহজমের লক্ষণ ও ঘরোয়া সমাধান : জানতে হবে

মাঝে মধ্যে বদহজম বা এসিডিটি হয় না এরকম মানুষ খুব কম আছে। তবে বদহজম বা ইনডাইজেশন একটি শারীরিক অবস্থা। এটা ডিসপেপসিয়া নামেও পরিচিত। এই অবস্থায় প্রায়শই পেটে ব্যথার সাথে একটা অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করে। পরিপাকজনিত সমস্যা বা বদহজমের জন্যই মূলত এই অবস্থা দেখা যায়।

বদহজম কেন হয়?

বদহজম কেন হয়

পাকস্থলীতে থাকা এসিড আপনার পাকস্থলীর আস্তরণ কিংবা গলায় জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। একারণে বদহজম হয় এবং আপনি জ্বালাপোড়া ও ব্যথা অনুভব করেন। গ্যাস্ট্রিক ক্যানসারের লক্ষণ হিসেবেও বদহজম দেখা দিতে পারে।

বদহজমের আরও কিছু কারণ:

খাদ্যাভ্যাসে ভুল

বদহজম হওয়ার পেছনে খাদ্যাভ্যাস একটি বড় কারণ হতে পারে। অনেকেই-

  • খাবার ভালোভাবে না চিবিয়ে খেয়ে থাকেন এবং খাবারের মাঝে বারবার পানি খেয়ে থাকেন
  • অতিরিক্ত পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ
  • তেল মশালাযুক্ত খাদ্য গ্রহণ

খাদ্য গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই শুয়ে পরা ইত্যাদি যা কিনা বদহজম ঘটাতে পারে।

অতিরিক্ত ঔষধ গ্রহণ  

অতিরিক্ত ঔষধ যেমন- অ্যাসপ্রিন বা আইব্রুফেন জাতীয় ঔষধ সেবন শরীরের জন্য মোটেও ভাল নয়। অতিরিক্ত পরিমাণে ওষুধ খেলে শরীরে এসিডের মাত্রায় তারতম্য ঘটে ফলে বদহজমের সৃষ্টি হতে পারে।

মদ্যপান বা ধূমপান

সিগারেটের ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ আমাদের শরীরের ভিতরের হজম সহায়ক এনজাইমগুলোকে নিঃসরণে বাধা দেয় ফলে হজম প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটায়। এর ফলে অনেকক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে শরীর কোন খাবার হজম করতে পারে না।  

অতিরিক্ত মদ্যপান বদহজমের সমস্যার জন্য দায়ী। বেশি মদ পান করলে তা শরীর থেকে পানি সরিয়ে কোষকে সংকুচিত করে তুলে। ফলে শরীরে পানি স্বল্পতা সৃষ্টি হয়ে বদহজম হতে পারে।

মানসিক চাপ

অতিরিক্ত মানসিক চাপ, মন খারাপ বা অবসাদ এবং দুশ্চিন্তা করলে তা শরীরের হরমোনের পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকে। আর এর ফলে শরীরে খারাপ এনজাইমের নিঃসরণ হয় যা খাদ্য হজমে ব্যাঘাত ঘটিয়ে থাকে।

ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ

এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ যার নাম Helicobacter pylori। এর কারণেও বদহজম হতে পারে

বদহজমের লক্ষণ

বদহজমের লক্ষণ

বদহজমের কারনে এক বা একাধিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

  • পেট ব্যথা
  • উপরের পেটে অস্বস্তি
  • পেট ফাঁপা
  • বমি বমি ভাব
  • অল্প খাওয়ার পরই পেট ভার ভাব

বদহজমের সমস্যা গুরুতর হলে অন্যান্য অনেক উপসর্গ দেখা যায়। সেইরকম কিছু হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

  • বমির সাথে রক্তপাত
  • ওজন হ্রাস
  • খাবার গিলতে অসুবিধা
  • কালো বর্ণের মলত্যাগ

বদহজম ও এসিড রিফ্লাক্সের মধ্যে পার্থক্য

বদহজমএসিড রিফ্লাক্স
বদহজম হল উপরের পেটে ব্যাথা বা অস্বস্তি।এসিড রিফ্লাক্স হল বুক জ্বালা-পোড়ার সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয়।
বদহজমের মূল কারণগুলো হল অতিরিক্ত খাবার খাওয়া, দ্রুত খাবার খাওয়া, ধূমপান ইত্যাদি।এসিড রিফ্লাক্সের মূল কারণগুলো হল বেশি খাবার খাওয়া, ভারী খাবার খাওয়ার পর পরই শুয়ে পরা, ঘুমানোর আগে স্ন্যাক্স খাওয়া ইত্যাদি।
এটা সম্পূর্ণটাই নির্ভর করে বদহজমের নির্দিষ্ট কারণ এবং তার প্রকারের ওপর। কারোর ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যে এই সমস্যা দূর হয়ে যায় কারো ক্ষেত্রে আবার দীর্ঘদিন যাবৎ এই সমস্যা স্থায়ী হতে পারে।এটি সাধারণত কিছু সময়ের জন্য (দুই ঘন্টা) পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এর প্রতিকার হল মসলাযুক্ত খাবার পরিহার করা এবং ধূমপান বর্জন করা, রাতের খাবার দেরিতে না খাওয়া।এসিড রিফ্লাক্সের প্রতিকার হল এন্টাসিড জাতীয় ওষুধ যা পাকস্থলির এসিডকে প্রশমিত করে।

বদহজমের ঘরোয়া চিকিৎসা

বদহজম দূর করতে আমরা সাধারনত ঔষধের উপর নির্ভর করে থাকি। কিন্তু আমরা চাইলে ঘরোয়া কিছু উপায় মেনে বদহজম দূর করতে পারি।

১। থেরাপি

মানসিক চাপের কারণেও অনেক সময় হজমের সমস্যা দেখা যায়। এইসব ক্ষেত্রে বদহজম দূরীকরণের জন্য সবার প্রথম মানসিক চাপ কমানো দরকার। আর মানসিক চাপ কম করার জন্য এবং প্রয়োজনীয় থেরাপির পরামর্শ গ্রহণের জন্য একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার।

২। খাদ্যাভ্যাস

  • খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাবার রোগীর উপসর্গ বাড়িয়ে দেয়। তাই এগুলো পরিহার করতে করা উচিত।
  • চা, কফি, কোমল পানীয় বাদ দিতে হবে।
  • অতিরিক্ত মসলা ও চর্বিযুক্ত খাবার বর্জন করতে হবে।
  • রাতের খাবার খাওয়ার ৩ ঘন্টা পর ঘুমাতে হবে।

৩। শারীরিক ব্যায়াম

যাদের বদহজমের সমস্যা তারা যদি কিছু ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম করেন তবে এই সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

কখন ঔষধ প্রয়োজন?

তবে কিছুক্ষেত্রে বদহজম বা এসিডিটির মাত্রা মারাত্মক আকার কিছু ঔষধ এসিডের পরিমাণ কমায় সেগুলো হল-

  • এন্টাসিড (Antacid)
  • প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর

তবে যাদের বদহজমের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে, তারা চিকিতসকের পরামর্শ নিয়ে ঔষধ গ্রহণ করতে পারেন। [2]

কোন কোন রোগে বদহজমের সমস্যা হয়?

  • হায়াটাস হার্নিয়া (Hiatus hernia)
  • গ্যাস্ট্রিক
  • পেপটিক আলসার
  • পাকস্থলীর ক্যান্সার 
  • গলগণ্ড ও অগ্নাশয়ের সমস্যা
  • গলব্লাডারে পাথর
  • কিডনীতে পাথর
  • খাদ্য নালীর অপারেশন 
  • Helicobacter pylori নামক জীবাণু দ্বারা সংক্রমণ 

গ্যাস্ট্রো-এসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (gastro-oesophageal reflux disease) হলেও বদহজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

গর্ভবতী মহিলাদের বদহজমের সমাধান

বদহজমের অপ্রীতিকর লক্ষণগুলি আরাম ও প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি পুরানো প্রতিকার ব্যবহার করা যেতে পারে। যদিও তাদের বেশিরভাগ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়, অনেক প্রত্যাশিত মায়েরা তাদের সহায়ক বলে মনে করেন ।

  • খাওয়ার পরে গর্ভবতী মহিলাদের পেটে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • খাবারকে ৫-৬ বেলায় ভাগ করে বারে বারে খেতে হবে।
  • খাবারটি গিলে ফেলার আগে ধীরে ধীরে চিবিয়ে খেতে হবে।
  • কফি এবং কোমল পানীয় সীমিত করতে হবে। গর্ভাবস্থায় এগুলি থেকে দূরে থাকা উচিত।
  • চর্বিযুক্ত খাবার, চকোলেট এবং অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ এগুলো বদহজমকে আরও খারাপ করে তোলে।
  • খাওয়ার সময় সোজা হয়ে বসে থাকতে হবে। এটি পেট থেকে চাপ সরাতে সাহায্য করে এবং হজমকে সহজ করে তোলে।
  • ঘুমোতে যাওয়ার কমপক্ষে দুই থেকে তিন ঘন্টা আগে রাতের খাবার শেষ করতে হবে।
  • বিছানায় শোবার সময় আপনার মাথা ও ঘাড় উঁচু অবস্থানে রাখতে হবে- এটি ঘুমের সময় পাকস্থলীর এসিড গলা পর্যন্ত উঠে আসা বন্ধ করতে পারে। 
  • খাবারের সময় পানি পান করবেন না কারণ এটি বদহজমের লক্ষণগুলিকে বাড়িয়ে তোলে। খাওয়ার আগে বা পরে পান করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
  • কোমরের চারপাশে আলগা এবং আরামদায়ক পোশাক পরিধান করতে হবে।
  • মানসিক চাপ কমাতে হবে।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

গর্ভাবস্থায় যদি উপসর্গগুলি আরও খারাপ হয়ে যায় তবে চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে।

  • খাবার গিলতে অসুবিধা
  • তীব্র গ্যাস হলে
  • বমি বা পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়ার সমস্যায় 
  • জ্বলন্ত সংবেদনের কারণে ঘুমাতে অক্ষম
  • কালো মল হলে
  • অতিরিক্ত ওজন কমে গেলে
  • পেটে তীব্র ব্যথা অনুভব করলে

গর্ভাবস্থায় বুকজ্বালা সন্তানের ক্ষতি করবে না বা প্রসবের উপর কোন প্রভাব ফেলবে না। তবে দীর্ঘস্থায়ী সময়কালের জন্য বুকজ্বালা থাকলে ডাক্তারের সাথে কথা বলতে হবে। এটি প্রি-এক্লাম্পসিয়ার চিহ্ন হতে পারে। এই অবস্থা প্রস্রাবের মধ্যে প্রোটিন এবং উচ্চ রক্তচাপ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। মায়ের পাশাপাশি শিশুর জন্য এটি খুব বিপজ্জনক হতে পারে।