Categories
খাদ্যাভ্যাস ঘরোয়া সমাধান

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করলার যত উপকারিতা

করলা স্বাদে তেতো হলেও, এতে থাকে অনেক পুষ্টিগুণ। করলায় থাকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, জিংকসহ বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করলার জুস খুবই উপকারী। উপমহাদেশ ও চীনের গ্রামাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসের ওষুধ হিসেবে করলার রস পান করে আসছেন। 

এছাড়া বাত রোগে, লিভার ও শরীরের কোনো অংশ ফুলে গেলে তা থেকে পরিত্রাণ পেতে করলা ভালো পথ্য। নিয়মিত করলা খেলে জ্বর, হাম ও বসন্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করলা

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করলা জুসের উপকারিতা

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিকের মত কাজ করে করলা। এতে এমন উপাদান আছে, যা ইনসুলিনের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিন করলা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এক গবেষণায় করলার অ্যান্টিডায়াবেটিক বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে। এটি গ্লুকোজ বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে একটি হাইপোগ্লাইসেমিক প্রভাব প্রয়োগ করে। [1]

করলার শাঁস, বীজ এবং সম্পূর্ণ উদ্ভিদের নির্যাসে একটি হাইপোগ্লাইসেমিক প্রভাব রয়েছে। করলার মধ্যে উপস্থিত স্যাপোনিন, অ্যালকালয়েড এবং পলিফেনলগুলি ইনসুলিন সহনশীলতা এবং গ্লুকোজ গ্রহণ বৃদ্ধির জন্য দায়ী। [2]

এছাড়াও করলায় কয়েকটি সক্রিয় পদার্থ আছে। তাদের মধ্যে একটি হলো চারেন্টিন। এটি রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখে। করলায় আরও আছে পলিপেপটাইড-পি বা পি-ইনসুলিন নামক একটি যৌগ। যা প্রাকৃতিকভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

করলা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কারণ এটি রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে পারে। ইনসুলিনের নিঃসরণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে করলা।

এছাড়াও করলায় কয়েকটি সক্রিয় পদার্থ আছে। তাদের মধ্যে একটি হলো চারেন্টিন। এটি রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখে। করলায় আরও আছে পলিপেপটাইড-পি বা পি-ইনসুলিন নামক একটি যৌগ। যা প্রাকৃতিকভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

করলা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কারণ এটি রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে পারে। ইনসুলিনের নিঃসরণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে করলা।

করলা কিভাবে রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে? 

করলা ইনসুলিন রেজিস্টেন্স কমিয়ে রক্ত থেকে শরীরের কোষগুলোর সুগার গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। তা ছাড়া করলা শরীরের কোষের ভেতর গ্লুকোজের বিপাক ক্রিয়াও বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তের সুগার কমে যায়।

বিজ্ঞানীরা মোট তিনটি উপাদান পেয়েছেন যাদের হাইপোগ্লাইসেমিক ক্রিয়া আছে – এই তিনটি উপাদান হলো – চারেন্টিন, ভিসিন, পলিপেপটাইড-পি। এদের মধ্যে চারেন্টিন এর খুব ভালো গ্লাইসেমিক প্রভাব আছে। এছাড়া করলাতে লেকটিন নামে একটি উপাদান পাওয়া যায় যা রক্তের গ্লুকোজের ঘনত্ব কমিয়ে দেয় |

করলা এবং করলা থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন উপাদানসমুহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে আমাদের রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এটি যেসব পদ্ধতিতে আমাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমায় সেগুলি হল-

  • এটি পেরিফেরাল এবং স্কেলেটাল পেশিতে গ্লুকোজের ব্যবহার বৃদ্ধি করে।
  • ক্ষুদ্রান্ত্রে গ্লুকোজের গ্রহণ কমায়।
  • গ্লুকোনিওজিক হরমোনের উৎপাদন ও ক্রিয়াকৌশলে বাধা প্রদান করে।
  • আইলেটস অব লেঙ্গারহেন্স এর বিটা সেলকে সংরক্ষণ করতে সাহায্য করে।

গবেষণা হতে দেখা যায় যে, করলার রস তাৎক্ষণিকভাবে ৩০ মিনিটের মধ্যে রক্তে শর্করার মাত্রা কমায় এবং ১২০ মিনিটে উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।

অর্থাৎ করলা ইনসুলিন রেজিস্টেন্স কমিয়ে রক্ত থেকে শরীরের কোষগুলোর সুগার গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। তা ছাড়া করলা শরীরের কোষের ভেতর গ্লুকোজের বিপাক ক্রিয়াও বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তের সুগার কমে যায়।

শরীরে করলার অন্যান্য উপকারিতা

ডায়াবেটিস কমাতে সাহায্য করে

করলা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য পথ্য হিসাবে বিবেচিত হয়। যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে তাদের বেশি পরিমাণে তেতো খাওয়া উচিত। করলা/উচ্ছের রস এবং এই গাছের পাতা নিয়মিত সেবন করলে তা রক্তে চিনির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।

১। হজমের জন্য ভাল– খাবার হজম করতে সহায়ক এবং হজম শক্তি বর্ধক এই সব্জি। তবে শুধু হজম শক্তিই নয়, করলা ফাইবারে পূর্ণ হওয়ায় এটি কোষ্ঠকাঠিন্যর মতো সমস্যা থেকেও মুক্তি দেয়।

২। হার্ট ভালো রাখে- এর তিক্ত রস এলডিএল অর্থাৎ খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি হ্রাস করে।

৩। প্রস্টেট ক্যান্সার- করলা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং অ্যালার্জি ও যে কোন রোগের সংক্রমণ রোধ করে। এটি ক্যান্সার কোষের বিস্তার রোধ করে। নিয়মিত করলা খেলে স্তন ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার এবং প্রস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

৪। ওজন নিয়ন্ত্রণ- ক্যালরি ও ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়ায় করলা ওজন হ্রাসে সহায়তা করে। এটি অ্যাডিপোজ কোষ যা দেহে ফ্যাট সংরক্ষণ করে, তার গঠন এবং বৃদ্ধি বন্ধ করে। এটি পরিপাক ক্রিয়া উন্নতি করে এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টগুলি শরীরকে ডিটক্সাইয়েটে সহায়তা করে যাতে চর্বি হ্রাস করতে পারে।

৫। ক্ষত নিরাময়ে করলা- করলার দুর্দান্ত একটি বৈশিষ্ট্য এটি। কোন স্থানে ক্ষত হলে করলার ব্যবহার তৎক্ষণাৎ ওই স্থানের রক্ত প্রবাহ এবং রক্ত জমাট বাঁধা নিয়ন্ত্রণ করে, যার ফলে ক্ষতের দ্রুত নিরাময় হয়।

৬। রক্ত পরিশোধক– করলাতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এটি রক্ত সঞ্চালন উন্নত করতে সহায়তা করে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।

৭। দেহে শক্তি জোগায়- নিয়মিত করলা সেবনে দেহে শক্তির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

৮। চোখের সমস্যা- করলা ভিটামিন এ সমৃদ্ধ, এটি ছানি প্রতিরোধ করে এবং দৃষ্টি শক্তিশালী করে। 

৯। শক্তিবর্ধক- করলার রস শক্তিবর্ধক হিসেবেও কাজ করে। এটি স্ট্যামিনা বাড়ানোর পাশাপাশি ভালো ঘুমে সহায়তা করে।

এছাড়াও এটি অনিদ্রার মতো সমস্যা হ্রাস করে। ডায়রিয়া ও পেটের অন্যান্য সমস্যাও কমাতে সহায়ক এই সব্জি। আমাদের দেহের ইমিউন সিস্টেমকে বাড়িয়ে তুলে শরীরকে রোগে সংক্রামিত হওয়ার থেকে সুরক্ষা প্রদান করে করলা।

  • যদিও এটি বেশিরভাগ মানুষের পক্ষে নিরাপদ, তবে এটি গর্ভবতী মহিলাদের খাওয়া উচিত নয় কারণ এর বীজ এবং রস প্রাণী গর্ভপাত ঘটানোর কারণ হিসেবে পরিচিত। 
  • বুকের দুধ খাওয়ানো মহিলাদের করলা খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। এর বিষাক্ত পদার্থের একটি সংখ্যা তাদের শিশুর ক্ষতি করতে পারে।
  • করলা খাওয়ার কারণে যে সমস্ত মানুষের গ্লুকোজ ৬ ফসফেট ডিহাইড্রোজিনেস এনজাইম ঘাটতির জন্য ‘ফেবিজম’ (লোহিত কণিকা ভেঙ্গে যায়, হিমোলিটিক রক্তাল্পতা ঘটায়) নামক অবস্থার বৃদ্ধি হতে পারে এবং তাদেরও এটি এড়িয়ে চলা উচিত। 
  • রস হিসাবে, যদি এটি বেশি পরিমাণে খাওয়া হয় তবে এটি পেট ব্যথা, ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে।

ডায়াবেটিক রোগীরা করলা কিভাবে খাবেন?

শুধু করলার জুস খেয়ে কি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? 

ঔষধ, শরীরচর্চা আর নিয়ম মেনে খাওয়া-দাওয়া করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে বটে, কিন্তু তা কোনভাবেই পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব নয়। তাই যদি কেউ ভেবে থাকেন যে কোন রকমের নিয়ম না মেনে শুধুমাত্র করলার জুস খেয়ে ডায়াবেটিস নিযন্ত্রণ করা যাবে তবে তা একেবারেই ভুল ধারণা।

একটানা কতদিন করলার জুস খাওয়া যাবে? 

তিন মাস টানা খাওয়ার পর ১২-১৫ দিন খাওয়া বন্ধ করতে হবে। বাজারে চলতি যে জুস পাওয়া যায়, সেগুলি না খাওয়াই ভাল। এতে সোডিয়াম বেনজোইট মেশানো থাকে ফলে এগুলির কার্যকারিতা একটু হলেও কম হবে।

অতএব দেখা যাচ্ছে, করলার গুণাগুণ ও উপকারিতা ব্যাপক। করলা শুধু ডায়াবেটিক রোগীদের জন্যই না, সবার জন্য স্বাস্থ্যকর একটি সবজি। এটি শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

Diabetes Ad
Categories
খাদ্যাভ্যাস

ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য তালিকা

ডায়াবেটিস রোগীকে সব সময় খাদ্যদ্রব্য ভালোভাবে বিবেচনা করে খাওয়া উচিৎ। তা না হলে রোগীর সুগার বেশি হয়ে ক্ষতির কারণ হতে পারে। ডায়াবেটিস ধরা পড়লেই রোগীরা অবিলম্বে তাদের খাদ্যের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিৎ। এই লেখায় ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য তালিকা কেমন হওয়া উচিৎ তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস আপনার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখাতে সাহায্য করবে। চলুনজেনে নিই ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্য তালিকায় কি কি থাকা উচিৎ

ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য তালিকা

ডায়াবেটিক রোগীর খাদ্য তালিকা কেমন হওয়া উচিৎ

একটি স্বাস্থ্যকর ও সুষম ডায়েটের জন্য পাচঁটি প্রধান গ্রুপ বা পদের খাবার খাওয়া প্রয়োজন। খাবারের মূল ৫টি গ্রুপ হল:

  • ফলমূল ও শাকসবজি
  • শ্বেতসার সমৃদ্ধ খাবারঃ লাল বা বাদামী চালের ভাত, লাল আটার রুটি বা পাউরুটি, আলু
  • প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারঃ ডিম, মাছ, মাংস, শিম ও অন্যান্য বীন, ডাল, বিভিন্ন ধরনের বাদাম,
  • দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারঃ দই, ছানা ও পনির এবং
  • বিভিন্ন ধরনের তেল, মাখন, ঘি

ফলমূল ও শাক সবজিঃ 

ফলমূল ও শাক-সবজিতে ভিটামিন ডি, খনিজ পদার্থ ও আঁশ প্রচুর পরিমাণে থাকে। কিন্তু ক্যালরির পরিমাণ অনেক কম থাকে। তাই এগুলো ডায়াবেটিস রোগীর খাবার তালিকায় রাখা উচিৎ। এগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও প্রধান ভূমিকা পালন করে।

কোন ফলগুলো খাওয়া ভাল?

  • সবুজ আপেল
  • আমড়া
  • আমলকি
  • কালো জাম
  • জাম্বুরা
  • জামরুল

এসব ফলের ক্যালরি খুব সামান্য এবং ফাইবারযুক্ত হওয়াই এগুলো ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশ উপকারী।

কিছু কিছু ফল থাকে , যেগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি থাকে। সে ধরনের ফলগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো যেমনঃ

  • আম
  • পাকা কলা
  • কাঁঠাল
  • পাকা পেঁপে

তাই বলে কী আম কলা একেবারেই খেতে পারবো না?

অবশ্যই খাওয়া যাবে যদি আপনার সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রনে থাকে। আম খেলে এক টুকরো খান এবং কলা খেলে সপ্তাহে ১টি খান। তবে ফলের রস খাওয়া যাবে না ডাইবেটিক রোগীদের। ফলের রসে কোনো রকম ফাইবার থাকে না শুধু মাত্র প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি থাকে তাই এটা না খাওয়াই উত্তম।

ফল ও শাক-সবজি কতটুকু খাওয়া উচিত?

প্রতিদিন কমপক্ষে ৫ পরিবেশন ফল ও শাক-সবজি খাওয়া উচিৎ। হাতের তালুতে যতটুকু খাবার উঠে তাকেই ১ পরিবেশন বলে।

ডায়াবেটিক রোগীর সুবিধার জন্য শাকসবজিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

শর্করা সম্বলিত সবজি

আলু, মিষ্টি কুমড়া, কাঁচা কলা, বরবটি, থোড়, মোচা, বিট, শিম, মাটির নীচের কচু, গাজর, কাঁকরোল, শিমের বিচি, কাঁঠালের বিচি, শালগম, ইঁচড়, ঢেঁড়স, বেগুন, মটর শুঁটি, কচুরমুখী, পাকা টমেটো।

শর্করাবিহীন শাকসবজি

সব ধরনের শাক, যেমন- লালশাক, পুঁইশাক, পালংশাক, কলমিশাক, ডাঁটাশাক, কচুশাক ইত্যাদি এবং সবজি যেমন  ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, ওলকপি, কাঁচা টমেটো, কাঁচা পেপে, শসা, খিরা, উচ্ছে, করলা, ঝিঙা, চিচিঙা, পটল, লাউ, চালকুমড়া, ডাঁটা, সজনা, ধন্দুল, ক্যাপসিকাম, কাঁচামরিচ, মাশরুম ইত্যাদি।

রান্নার উপরও ডায়াবেটিক রোগীর রক্তে শর্করার বাড়া-কমা অনেকটা নির্ভর করে। যেমন- আলুর চিপস বা ফ্রেন্সফ্রাইয়ের চেয়ে সিদ্ধ আলু খেলে শর্করার পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। গাজর কাঁচা না খেয়ে সিদ্ধ অবস্থায় খেলে শর্করার পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়। তবে সবজি বেশি সিদ্ধ না করে একটু কাঁচা কাঁচা করে রান্না করা উচিত। এতে স্বাদ, গন্ধ, রঙ এবং ভিটামিন অটুট থাকে। [সূত্র]

শর্করা জাতীয় খাবার

আমাদের শরীরে কার্বোহাইড্রেট এর বিশাল ভূমিকা রয়েছে, এটি শরীরের চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং কি ধরনের শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়া হচ্ছে এ ব্যাপারে খেয়াল রাখা উচিত। কারণ কিছু শ্বেতসারজাতীয় খাবার খুব দ্রুত রক্তে সুগার তথা গ্লুকজের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এসব খাবারকে বলা হয় উচ্চ ‘গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই)’-যুক্ত খাবার। আবার কিছু স্লো রিলিজ শর্করা জাতীয় খাবার রয়েছে যাদের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। এগুলো ধীরে ধীরে শরীরে রক্তের সাথে মিশে ও ধীরে ধীরে ইনসুলিন নিঃসরণে সাহায্য করে।

লাল আটার রুটি, লাল চালের ভাত, ব্রাউন ব্রেড, ওটস, ওটমিল, চিড়া ইত্যাদি হল জটিল শর্করা। এদের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। এগুলোতে উচ্চ পরিমাণে আঁশ থাকে। এতে করে খাদ্যআঁশ রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

আঁশ যুক্ত খাবার সনাক্তকরণ

কি পরিহার করবেনকি গ্রহন করবেন
সাদা চালের ভাতবাদামি বা লাল চাল এর ভাত
রেগুলার পাস্তাগমের পাস্তা, স্পেগেটি
সাদা পাউরুটিগমের রুটি, লাল আটার রুটি
চিনিযুক্ত সেরিয়ালগোল ওটস
কর্ণফ্লেক্সসবুজ শাক
ইনস্ট্যান্ট ওট মিলআঁশ ও কম চিনি যুক্ত সেরিয়াল

প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার

খাদ্যতালিকায় প্রোটিন একটা আবশ্যিক বিষয়। প্রোটিন এমন ম্যাক্রো নিউট্রিয়েন্ট যা কখনোই বাদ দেওয়া উচিৎ নয় কারণ এটা কোষ মেরামত ও ভাগ করতে সাহায্য করে। প্রোটিন ক্ষুধা নিবারণ করতে সাহায্য করে। পেশি গঠনে সহায়তা করে। এটি দীর্ঘ সময় ধরে পেট ভরা রাখে।

কিছু গবেষণায় টাইপ 2 ডায়াবেটিসের সফল ব্যবস্থাপনা পাওয়া গেছে যার মধ্যে রয়েছে খাবারের পরিকল্পনার সাথে সামান্য উচ্চ মাত্রার প্রোটিন (২০-৩০%), যা তৃপ্তি বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে। ডায়াবেটিক কিডনি রোগে আক্রান্তদের জন্য (অ্যালবুমিনিউরিয়া অথবা গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট হার কম),  প্রতিদিন প্রতি কিলোগ্রাম শরীরের ওজনের ০.৮ গ্রাম খাদ্যের প্রোটিন সুপারিশ করা হয়েছে। [সূত্র]

উদ্ভিদ ও প্রাণীভিত্তিক উভয় খাবারেই প্রোটিন বিদ্যমান থাকে। ভাল প্রোটিন জাতীয় খাবার হলো ডিম, অল্প চর্বি জাতীয় দুধ, টক দই, দেশজ মাছ ও মুরগি ইত্যাদি। ডায়াবেটিস রোগীদের প্রোটিন জাতীয় খাবারে বাধা নেই যদি না তাদের কিডনি তে কোন জটিলতা না থাকে। অতিরিক্ত ক্যালরি এড়াতে বেকিং বা গ্রিল করার চেষ্টা করতে হবে ও  ভাজা এড়িয়ে চলতে হবে। তবে লাল মাংস (যেমন গরু, খাসি ও ভেড়ার মাংস) ও প্রক্রিয়াজাত মাংস (সসেজ, পেপারনি ও সালামি)-এর পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে, কারণ এগুলো খাওয়ার সাথে ক্যান্সার ও হার্টের রোগের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। 

দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার

খনিজ পদার্থ থেকে প্রোটিন নানা পুষ্টি উপাদানে ভরপুর হলো দুধ। এছাড়াও রয়েছে রকমারি ভিটামিন এবং ক্যালসিয়াম। এই সব উপাদানই ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের জন্য জরুরি। দুধে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি রয়েছে যা হাড়ের শক্তি বজায় রাখে। ডায়াবেটিক রোগীরা দুগ্ধজাত খাবার যেমন-টক দই, মাঠা খেতে পারেন।

ডায়াবেটিক রোগীরা দুধ কিভাবে খেতে পারেন?

ডায়াবেটিক রোগীর খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন ধরনের তেল

চর্বি যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি রয়েছে এর অনেক গুন। উপকারী চর্বি যেমন, বাদাম, অলিভ ওয়েল, মাছের তেল ইত্যাদি ডায়াবেটিক রোগীরা খেতে পারে। তবে ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় খাবারের অতিরিক্ত গ্রহণ ডায়াবেটিক রোগীর জন্য ক্ষতিকর।

স্বাস্থ্যকর চর্বিঃ অসম্পৃক্ত চর্বি সবচেয়ে ভাল, এটির প্রধান উৎস হল মাছ ও উদ্ভিজ্জ তেল যেমন–  অলিভ অয়েল, বাদামের তেল ইত্যাদি। মাছের তেলে থাকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড যা বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করার  পাশাপাশি মগজ ও                                           হৃদপিণ্ডকে সবল রাখে।

অস্বাস্থ্যকর চর্বিঃ সবচেয়ে খারাপ চর্বি হল ট্রান্স ফ্যাট। ডিপ ফ্রাই খাবার, একই তেলে ভাজা খাবার, প্যাকেটজাত খাবার, প্রাণীজ তেলে ভাজা খাবার হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর চর্বি

সম্পৃক্ত চর্বিঃ সাধারণত বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য, লাল মাংস, ট্রপিক্যাল তেল এর উৎস।  এটি খাওয়া যেতে পারে, কিন্তু হিসেব করে।

কি ভাবে অস্বাস্থ্যকর চর্বি বা তেল পরিহার করবেন?

  • চিপস বা ক্র্যাকারস এর পরিবর্তে বাদাম বা বীজ জাতীয় খাবার খেতে পারেন। সাধারণ বাটার বা মাখনের পরিবর্তে পিনাট বাটার বেশ ভাল
  • খাবার কড়া করে ভাজার পরিবর্তে হালকা তেলে ভাজি, সিদ্ধ খাবার বা সেকা খাবার খেতে পারেন
  • প্যাকেটজাত খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার করুন
  • লাল মাংসের (যেমন– গরুর মাংস) পরিবর্তে চামড়াবিহিন মুরগির মাংস, মাছ, কুসম ছাড়া ডিম ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন খেতে পারেন
  • পাস্তা, সবজি ও সালাদে জলপাইয়ের তেল ব্যবহার করতে পারেন
  • স্যান্ডউইচ, বার্গার ইত্যাদির মাংসে থাকে অসম্পৃক্ত চর্বি, এগুলোতে মাংসের বদলে   সবজি যোগ করলে খাবারে ভিন্নমাত্রা আসবে
  • পরিমিত দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে কি কি খাবার বাদ দিতে হবে

ডায়াবেটিস খাবার নিয়ে কিছু ভুল ধারনা

ডায়াবেটিস রোগের খাবার নিয়ে অনেক সময় কিছু ভুল ধারনা মানুষের মধ্যে দেখা যায়-

  • অতিরিক্ত চিনি খাওয়া ডায়াবেটিসের কারণ
  • ডায়াবেটিস হলে আপনাকে অবশ্যই সবার থেকে আলাদা খাবার খেতে হবে
  • মিষ্টি জাতীয় খাবার একেবারেই খাওয়া যাবে না
  • একেবারেই শর্করা সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া যাবে না

কেমন হওয়া উচিত ডায়াবেটিক রোগীর ডায়েট চার্ট

প্রত্যেক ডায়াবেটিক রোগীর জন্য কিন্তু খাদ্যতালিকা একরকম হবে না। ডায়াবেটিক রোগীদের খাবার ক্যালোরির উপর নির্ভর করে। প্রত্যেক রোগীর ইনসুলিন উত্পাদনের মাত্রা, রক্তে সাধারণভাবে বিদ্যমান চিনির মাত্রা, বয়স, লিঙ্গ, উচ্চতা, ওজন, কাজ ইত্যাদি অনুপাতে সংশ্লিষ্ট পুষ্টিবিদের কাছে গিয়ে খাদ্যতালিকা তৈরি করা হয়।

ডায়াবেটিক রোগীদের সঠিক পরিমাণ খাবার খাওয়া এবং সঠিক সময়ে খাবার খাওয়ার ওপর বিশেষ নজর দিতে হয়। খাদ্যের নিয়ম না মানলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। তবে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি যদি শারিরিক অন্য কোন জটিলতা থাকে তবে সে ক্ষেত্রে রোগীর চাহিদা ও অবস্থা অনুযায়ী ডায়েট প্লান করতে একজন ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নিতে হবে।

এখানে একজন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ১৬০০ ক্যালরির চাহিদার একটি স্যাম্পল ডায়েট চার্ট বা খাবারের মেন্যু দেয়া হল।

সকালের নাস্তাপরিমাণ
গমের আটার রুটিসর্বচ্চ ৩ টা (৯০ গ্রাম)
ডিম অথবা ডাল১টা অথবা (১০ গ্রাম)
সবজি তরকারিপ্রয়োজন অনুসারে